প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় মানুষের জীবন অনেকখানি বদলে গেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে মানুষ তার জীবনমান উন্নয়নে এটিকে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে চলছে। সৌরবিদ্যুতের আলোয় মেঘনা তীরবর্তী জেলেদের জীবনেও এমন পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। লক্ষ্মীপুরের মেঘনা পাড়ের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

এক সময় উপকূলের জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ নদীতে মাছ শিকারে যেত কুপি বাতির আলো জ্বালিয়ে। বাতাসে বাতি যেন নিভে না যায় সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থার সাহায্য নিত তারা। স্থানীয় ভাষায় এ পদ্ধতিতে আলো জ্বালানোকে বোম্বা বাতি বলা হয়। কিন্তু তাতেও  জেলেদের স্বাচ্ছন্দ্যে রাতের বেলায় মাছ ধরাসহ প্রয়োজনীয় কাজ করতে অসুবিধা হতো। এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। জেলেদের এমন অনেক সমস্যা এখন সহজ হয়ে এসেছে প্রযুক্তির কল্যাণে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ঝড়-তুফান ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সমুদ্রে মাছ ধরে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের আমিষের  জোগান দেন এই মৎস্যজীবীরা।

জেলেদের হাতের নাগালে আসায় তারাও প্রযুক্তির ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বিকালের ক্লান্ত রোদ বিদায়ের পর সন্ধ্যার আকাশে আঁধার নেমে আসে। তখনই মিটিমিটি আলোয় জ্বলে ওঠে ভাসমান নৌকায়  সৌর বিদ্যুতের বাতি। সৌর শক্তির চিকচিকে আলোয় ভরপুর থাকে নৌকার প্রতিটি কোণ। রাতে ইলিশ শিকারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, জাল মেরামত করা, নদীতে জাল ফেলা, জাল উঠানো, ইলিশ সংগ্রহ, রান্নার কাজÑ সব কিছুতেই জেলেদের সঙ্গী সৌর আলো। মতিরহাট ইলিশঘাটের সাবেক সভাপতি মেহেদী হাসান লিটন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গত ৫-৭ বছর থেকেই স্থানীয় জেলেরা সৌরবিদ্যুত ব্যবহার করছেন। এর ফলে তাদের আগের মতো ঝামেলা পোহাতে হয় না। সৌরবিদ্যুতের আলোয় জেলেরা রাতের বেলা মাছধরাসহ, ট্রলারে রান্নাবান্না, ফোন চার্জ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাজ সারতে পারছেন। এক কথায় বদলে  গেছে জেলেদের জীবন। জেলেরা এটি ব্যবহার করায় আনন্দিত বলেও জানান তিনি।

নদীপাড়ে গেলে প্রায়ই শোনা যায় জেলেদের কণ্ঠে সুমধুর গান। নৌকা থেকেই জেলেদের গানের আওয়াজ ভেসে আসে। মূলত, সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে জেলেরা এখন সাউন্ড বক্সে গানও শুনছেন। যার ফলে উচ্চ শব্দে এসব গান শোনার সুযোগ পান আশপাশের অন্য জেলেরাও। এতে নিজেদের বিনোদনের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অন্যরাও বিনোদন পান। এক সময় মুঠোফোনে চার্জ দেওয়ার জন্য পল্লীবিদ্যুতের সংযোগের জন্য এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটতে হতো। সৌরবিদ্যুৎ থাকায় এখন আর সে ঝামেলা পোহাতে হয় না। মুঠোফোনের মাধ্যমেই তারা যুক্ত হতে পারছেন অনলাইন দুনিয়ায়। 

মোট কথা, প্রযুক্তি যেন পুরো পৃথিবী জেলেদের হাতে এনে দিয়েছে। সৌরবিদ্যুতের এমন সংযোগের জন্য গ্রামীণ শক্তি, উপকূলীয় বিদ্যুতায়ন এবং রিমসো সোলার সংস্থাকে কাজ করতে দেখা যায়। স্থানীয় বাজারগুলোতে সংস্থাগুলোর ডিলাররা কাজ করেন। যে কোনো সমস্যায় দ্রুত সমাধানের পথও বের করে দিচ্ছেন ওই ডিলাররা। এতে সৌরশক্তি ব্যবহার অনেক সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

শুধু যে উচ্চবিত্তের মানুষ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিলাসী জীবন কাটাবে, এমন নয়। প্রয়োজনের তাগিদে সৌরশক্তি ব্যবহার হলেও জেলেরা ঝুঁঁকছেন বিলাসী জীবনে। বৈদ্যুতিক পাখায় গায়ে বাতাস লাগিয়ে প্রশান্তি পাওয়া কিংবা রঙিন ঝিলিক বাতি জ্বালানোর শখও মেটাচ্ছেন তারা। নদীর পাড়ে গেলে নৌকার দিকে চোখ ফেরালে নানা রঙের ঝলমলে আলো চোখে পড়ে। এতে অবাকও হতে পারেন। বুঝবেন জেলেরা মনের আনন্দে সময় পার করছে। রঙিন আলো তাদের মনকে দোলা দিয়ে যায়।

উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চল লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মতিরহাট মেঘনাতীর। প্রকৃতির অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যে গড়ে ওঠা এ স্থানটি ইতিমধ্যে নজর কেড়েছে কাছের ও দূরের পর্যটকদের। ভ্রমণপিপাসু বহু পর্যটক ও পর্যটনমুখী অনেক সংগঠনের বিচরণ জেলার কমলনগরের মতিরহাটের মেঘনাতীরে। এখানের সুন্দর সৈকত যে কারও মনের গভীরে নাড়া দেবে। এখানে আছে বড় একটি ইলিশ ঘাট। যেখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্থান থেকে জেলেদের আসা-যাওয়া। মেঘনাতীরের আকাশে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে নৌকার আলোচ্ছটা ছড়িয়ে পড়ে নদীর স্বচ্ছ জলে। আর জেলেরা তখন রাতের প্রয়োজনীয় সব কাজ সারেন সৌরশক্তির আলোয়। বেশ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘এখন আর বাতাসে বাতি নিভে যাওয়ার ভয় নেই। মাছ ধরি, আর ভালোভাবে জীবন কাটাই। আমাদের আয় রোজগারেও অনেক সুবিধা হচ্ছে। এখন আর দুশ্চিন্তায় অন্ধকারে পড়ে থাকতে হয় না আমাদের। ঝড়-তুফানের মধ্যে আমরা আমাদের কাজ করে যেতে পারি।’ ব্যক্তিগতভাবে নানামুখী সংকট থাকলেও সৌরশক্তির আলোয় জীবন এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে বলে জানান মৎস্যজীবীরা।

তথ্য সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন