Green Energy Foundation of Bangladesh (GEFB)

সৌরবিদ্যুৎ এবার জাতীয় গ্রিডে

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে।আগামী বছর আরও পাঁচ কেন্দ্র থেকে ৩৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যাবে

জামালপুরের সরিষাবাড়ীর সিমলা বাজার এলাকার লোকজন এ রকম দৃশ্য এর আগে দেখেনি—আট একর জায়গাজুড়ে সারি সারি সোলার প্যানেল বসানো। সেগুলোর চকচকে পিঠ তাক করা আকাশের দিকে। সোলার প্যানেল গ্রামবাসীর কাছে নতুন কিছু নয় বটে, কিন্তু একসঙ্গে এত প্যানেল কেউ দেখেনি।

সরিষাবাড়ীর এই ব্যতিক্রমী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনে সরকারি এবং দেশি-বিদেশি বেসরকারি খাতের মধ্যে এক অনন্য সহযোগিতার ক্ষেত্র গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রটির জন্য জায়গা দিয়েছে সরকারি খাতের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। আর বিনিয়োগ করেছে বেসরকারি খাত। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে জার্মানির আইএফই এরিকসেন এজি এবং দেশের কোম্পানি কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড ও জুপিটার এনার্জি লিমিটেড। এই তিন প্রতিষ্ঠান মিলে গঠন করেছে যৌথ বিনিয়োগের কোম্পানি ‘আইএফই-সিপিসি-জেইএল কনসোর্টিয়াম’।

সরিষাবাড়ীতে পিডিবির ৩৩/১১ হাজার ভোল্টের যে বিতরণ উপকেন্দ্রটি রয়েছে, সেটিকে ঘিরে পিডিবির মালিকানাধীন আট একর জায়গা পড়ে ছিল। সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসাতে কাজে লাগানো হয়েছে সেই অব্যবহৃত জমি। কাছাকাছি চলে গেছে ৩৩ হাজার ভোল্টের লাইন। এই কেন্দ্রের ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ওই সরবরাহ লাইন দিয়ে জাতীয় গ্রিডে প্রবেশ করছে। কেন্দ্রটি থেকে সরকার তথা পিডিবি প্রতি ইউনিট (১ কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুৎ কিনছে প্রায় ১৪ টাকা ৭৫ পয়সা দরে। সরকার তথা পিডিবি আগামী ২০ বছর কেন্দ্রটি থেকে এই দামে বিদ্যুৎ কিনবে।

বর্তমানে জ্বালানির দাম কম হওয়ায় ফার্নেস তেল, এলএনজি, কয়লা, ইউরেনিয়াম প্রভৃতি জ্বালানি থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকার বেশি খরচ হয় না। সেই হিসাবে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও দাম এখনো অনেক বেশি। তবে পরিবেশ সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদে দাম কমে আসবে বলে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হচ্ছে।

তা ছাড়া প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ক্রমেই কমে আসছে। সরকার তথা পিডিবি সর্বশেষ যে কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে, সেটিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে ১২ টাকা ৮০ পয়সা। দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড রংপুরের গঙ্গাচড়ায় কেন্দ্রটি স্থাপন করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এবং দেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র স্থাপনে অর্থায়ন করছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ করা হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ২০২০ সালে দেশে মোট ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের। সেই হিসাবে ওই সময়ে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে সাবেক বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ইডকলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী এম ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎই আমাদের ভবিষ্যৎ। জ্বালানি খাতকে এদিকেই যেতে হবে। তবে বাংলাদেশে জমির স্বল্পতা থাকায় চেষ্টা করতে হবে সৌর প্যানেল যে জমিতে বসানো হচ্ছে, সেই জমি পতিত ফেলে না রেখে বিকল্প ব্যবহারের উপায় উদ্ভাবন করা।’ তিনি আরও বলেন, সারা বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে। প্যানেলগুলোর দক্ষতা (এফিশিয়েন্সি) বাড়ছে। ফলে অল্প জায়গা ব্যবহার করে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়তেই থাকবে।

সরিষাবাড়ীর কেন্দ্রটি স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিয়েছে জার্মানির একেএ ব্যাংক। কেন্দ্রটি স্থাপনের পর সফলভাবে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর্যায় শেষে গত ২ আগস্ট বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। তখন থেকে এই কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

পিডিবির সরিষাবাড়ীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সৈয়দ মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ওই এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬ মেগাওয়াট। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়ার আগে ৩ মেগাওয়াটের মতো পাওয়া যেত। এখন গ্রিডে সরবরাহ করা হলেও গ্রিড থেকেই আবার সরিষাবাড়ী এলাকায় ৬ মেগাওয়াটের মতোই বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এখন আর ওই এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে না। ফলে গ্রাহকের গালাগালি থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে।

কনকর্ড-প্রগতি কনসোর্টিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) গোলাম মোস্তফা বলেন, তাঁদের নির্মিত কেন্দ্রটিতে ১৫ জুলাই পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। তখন থেকে নির্ধারিত ক্ষমতা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর আরও জোর দেওয়া উচিত।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আরও পাঁচটি বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি সই হয়েছে। এগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা ৩৩২ মেগাওয়াট।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতিসংঘের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গ্লোবাল চেঞ্জের নির্বাহী পরিচালক আহসান উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সৌরবিদ্যুতের বড় সুবিধা হচ্ছে এর প্রযুক্তি দ্রুত এগোচ্ছে। তা ছাড়া এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু করে তা গ্রিডে নিতে এক বছরের বেশি লাগে না। ফলে বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক দেশই এগিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাপী কম জমি ব্যবহার করে বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গবেষণা চলছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃস্বরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য। তবু বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা পাবে।

তথ্য সুত্র ঃ প্রথম আলো