Green Energy Foundation of Bangladesh (GEFB)

যে গ্রামে ভাগাভাগি হয় সৌরবিদ্যুৎ

চারপাশে জলাশয়। মাঝখানে ছোট ছোট দ্বীপের মতো কয়েকটি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রাম ‘সাকিম আলী মাতবর’। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার এই প্রত্যন্ত গ্রাম এখন বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে। গ্রামটিতে এমন এক পরীক্ষা চলছে, যা অনুকরণীয় হয়ে উঠবে বিশ্বের অনেক পশ্চাৎপদ জায়গায়।

গ্রামের আটটি পরিবার তাদের ঘরে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে। একজনের বাড়িতে উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুৎ চলে যায় আরেকজনের ঘাটতি পূরণে। এভাবে একপ্রকার বিদ্যুৎ লেনদেন ঘটে নতুন এক প্রযুক্তির মাধ্যমে।

সাকিম আলী মাতবর গ্রামের এই উদ্যোগ এক নতুন ধারণা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ু-সংক্রান্ত প্যানেল (ইউএনএফসিসিসি) এ বছর বিশ্বের যে ১৩টি প্রকল্পকে ‘মোমেন্টাম ফর চেঞ্জ’ নামের জলবায়ু অ্যাওয়ার্ড দিতে যাচ্ছে, এই গ্রামের প্রকল্প তার একটি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর অ্যাওয়ার্ডের তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মরক্কোর মারাকাসে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে এই পুরস্কার তুলে দেবেন। এর আগে গত জুনে জার্মানি ইন্টার সোলার অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে এই প্রকল্প।

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সাকিম আলী মাতবর গ্রামের একটি বাড়ির টিনের চালায় সৌর বিদ্যুতের প্যানেল মেরামতের কাজ চলছে l ছবি: সাহাদাত পারেভজ
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সাকিম আলী মাতবর গ্রামের একটি বাড়ির টিনের চালায় সৌর বিদ্যুতের প্যানেল মেরামতের কাজ চলছে l ছবি: সাহাদাত পারেভজ

এক বাড়িতে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ অন্য বাড়িতে পাঠানোর জন্য পরিবারগুলোকে ঘরে স্থাপন করতে হয়েছে ‘সোলবক্স মিটার’ নামের একটি বিশেষ ধরনের যন্ত্র। বিদ্যুৎ ভাগাভাগির এই উদ্যোগের নেপথ্যে যে প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রেখেছে, তাদের মধ্যে গবেষণা প্রকল্পটির দলনেতা ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ অংশীদারত্বের প্রযুক্তি সরবরাহকারী সংস্থা সোলশেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সেবাস্তিয়ান গ্রো ও উপকূলীয় বিদ্যুতায়ন ও মহিলা উন্নয়ন সমিতির (উমোবাস) নির্বাহী পরিচালক এম নাসির উদ্দিন এই পুরস্কার গ্রহণ করতে নভেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে মরক্কো যাচ্ছেন।

ইউএনএফসিসিসির ওয়েবসাইটে এই প্রকল্পের পরিচিতিমূলক লেখায় বলা হয়েছে, শরীয়তপুরের এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বে প্রথমবারের মতো যে কেউ বাড়িতে সোলার সিস্টেম স্থাপন না করেই তারের মাধ্যমে সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। আর এতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিকেও কাজে লাগানো হয়েছে।

গত নভেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই প্রকল্প সম্পর্কে কথা হয় সাকিম আলী মাতবর গ্রামের সালাম মাতবরের সঙ্গে। বছর চারেক আগে তিনি থাকতেন রাজধানীর গাবতলী এলাকায়। ট্রাক চালাতেন। অসুস্থ হয়ে এখন গ্রামের পারিবারিক ভিটায় উঠেছেন। এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, তাই বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ লাগিয়েছেন। গত নভেম্বরে বাড়িতে সোলবক্স মিটার স্থাপন করে যুক্ত হয়েছেন গ্রামে স্থাপন করা ছোট্ট গ্রিডের সঙ্গে। ২০০ টাকা পেয়েছেন গত মাসে বাড়তি বিদ্যুৎ বিক্রি করে।

এক বাড়ির বাড়তি বিদ্যুৎ ভাগাভাগি হয় আরেক বাড়ির সঙ্গে l ছবি: প্রথম আলো
এক বাড়ির বাড়তি বিদ্যুৎ ভাগাভাগি হয় আরেক বাড়ির সঙ্গে l ছবি: প্রথম আলো

সালাম মাতবরের ভাই দিপু মাতবরের আর্থিক সামর্থ্য কম, তাই তিনি বাড়িতে ছোট্ট একটি সৌর প্যানেল লাগিয়েছেন। বাড়িতে মেহমান এলে বেশি বিদ্যুৎ লাগে। তখন তিনি ছোট গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বেশি দাম দিয়া সোলার প্যানেল কিনতে হইল না। আবার প্রয়োজনে যথেষ্ট বিদ্যুৎও পাইতেছি। এর চেয়ে সুবিধা আর কী হইতে পারে বলেন?’

ভাবনাটি অতি সাধারণ। কিন্তু এটি বাস্তবায়নের পেছনে জড়িত বহু মানুষের শ্রম, চিন্তা ও পরিকল্পনা। এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়নকারী সরকারি সংস্থা ইডকল। সোলবক্স মিটার উদ্ভাবন ও তৈরি করেছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান সোলশেয়ার। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা জার্মান নাগরিক সেবাস্তিয়ান গ্রো বাংলাদেশি নারী ফারজানা তাবাসুমকে বিয়ে করে বাংলাদেশেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এই মিটারকে কীভাবে আরও সহজ ও সস্তা করা যায়, সে জন্য ঢাকায় একটি গবেষণা ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

ইউএনএফসিসিসি থেকে আরও বলা হয়েছে, সাধারণত গ্রামের মানুষ তাদের ঘরে যে সোলার প্যানেল স্থাপন করে, তাতে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ অব্যবহৃত থাকে। এই অব্যবহৃত বিদ্যুৎ অন্যদের কাছে বিক্রি করে অন্যের চাহিদা মেটানোর চিন্তা থেকেই এই প্রকল্প শুরু। এই তথ্য উল্লেখ করে উমোবাসের নির্বাহী পরিচালক এম নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শরীয়তপুরের সফলতা আমাদের উজ্জীবিত করেছে। আমরা মনে করি বাংলাদেশের যেসব গ্রামে সরকারি গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোলশেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেবাস্তিয়ান গ্রো প্রথম আলোকে বলেন,‘আমাদের এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের খরচ ২৫ শতাংশ কমে যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এক লাখ পরিবারে এই মিনি গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া যাবে।’

বিদ্যুতের খরচ

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, একেকটি মিটার তৈরি করতে বর্তমানে তিন থেকে চার হাজার টাকা লাগছে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে হওয়ায় এখন তা গ্রামবাসীকে বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এই মিটার হিসাব রাখছে, একজন গ্রাহক কতটুকু নিজের সোলার প্যানেল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, আর কতটা সরবরাহব্যবস্থা থেকে ধার করছেন। ধার করা বিদ্যুৎ তাঁকে অর্থ দিয়ে কিনতে হবে। একইভাবে একজন গ্রাহক কতটুকু বিদ্যুৎ ধার দিলেন, সেটির হিসাব রাখবে এই মিটার। প্রতি ইউনিট (অ্যাম্পিয়ার/ ঘণ্টা) বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য ১ টাকা ৬৫ পয়সা আর একই ইউনিট বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য ১ টাকা ৪৫ পয়সা। প্রতি ইউনিট কেনাবেচার মধ্যবর্তী ব্যবধান ব্যয় হয় এই ব্যবস্থাটি চালানোর পেছনে।

তথ্য সুত্র ঃ প্রথম আলো