Green Energy Foundation of Bangladesh (GEFB)

দিনাজপুরে তরুণদের উদ্ভাবিত সোলার সাইকেল

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। সারা দেশেই আড়ালে-আবডালে ঘটে চলেছে অভাবনীয় বিপ্লব। উন্নয়ন-উৎপাদন, প্রযুক্তিতে দেশের ঈর্ষণীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। একের পর এক সম্ভাবনার হাতছানিতে বাংলাদেশ পৌঁছে যাচ্ছে স্বর্ণশিখরে। জিঞ্জিরা শিল্প, ধোলাইখাল ব্র্যান্ড, বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ব্যতিক্রমী সাফল্যের পর কৃষিক্ষেত্রেও নীরব বিপ্লব অর্জিত হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবন ও উৎপাদিত ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিশ্ববাজারেও ঠাঁই পেয়েছে। সুই, ব্লেড, আলপিন, নাটবল্টু, রেল-বিমানের যন্ত্রাংশ, ফ্লাস্ক, মোবাইল ফোনসেট থেকে শুরু করে সমুদ্রগামী জাহাজ পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে দেশে। পাশাপাশি মেধাবী তরুণরা নতুন নতুন আবিষ্কারে দেশকে নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে আরেক উচ্চতায়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, এমনকি লেখাপড়া না জানা তরুণরাও অবিস্মরণীয় সব উদ্ভাবনের মাধ্যমে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে।ভোলার এক খুদে বিজ্ঞানী রাজুও তৈরি করেছে জ্বালানিবিহীন মোটরসাইকেল।

শতভাগ পরিবেশবান্ধব এ মোটরসাইকেল চলতে কোনো রকম জ্বালানি লাগবে না। মাত্র ১২ টাকা খরচেই পাড়ি দেবে দেড়শ কিলোমিটার পথ। উদ্ভাবনে আরেক ধাপ এগিয়ে গেছেন বগুড়ার যন্ত্রকৌশলী আমির হোসেন। তিনি জ্বালানিবিহীন গাড়ি উদ্ভাবন করেছেন। মাত্র ২৫ টাকার কার্বন খরচ করেই আমির হোসেনের গাড়ি টানা আট ঘণ্টা চলতে পারে, বহন করতে পারে যাত্রী ও মালামাল। গাড়ির ক্ষেত্রে আরও ব্যতিক্রম উদ্ভাবন রয়েছে বাংলাদেশের। ফরিদপুরের স্বল্পশিক্ষিত দরিদ্র হাবিবুর রহমান ইমরান সম্প্রতি এমন এক গাড়ি প্রস্তুত করেছেন, যে গাড়ি জলে-স্থলে সমানভাবে চলাচল করতে পারে। যশোরের চৌগাছার মাদ্রাসাছাত্র ১৭ বছরের তরুণ আবদুল্লাহ আল ফাহিম খেলতে খেলতে রীতিমতো ড্রোন আবিষ্কার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এই খুদে বিজ্ঞানীর তৈরি করা আকাশযানটি রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে উড়ছে দূর আকাশে, দারুণ গতিতে। এভাবেই নিত্যনতুন আবিষ্কারের উল্লাসে মেতে উঠেছে বাংলার তারুণ্য। বিদ্যুৎ ছাড়াই ভাল্ব জ্বালানো, হিমাগার স্থাপন, মোবাইল নিয়ন্ত্রিত হুইল চেয়ার বানানোর পাশাপাশি অভিনব সিকিউরিটি ডিভাইস আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মেধার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন এ দেশের তরুণ বিজ্ঞানীরা। এখন দরকার শুধু উৎসাহমূলক সহায়তা নিয়ে এসব বিজ্ঞানীর পাশে দাঁড়ানো। সরকারি ন্যূনতম সহায়তায় উদ্ভাবন-আবিষ্কারে নতুন নতুন দৃষ্টান্ত গড়ে ওঠার আশাতেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।

১৩ হাজারেই তৈরি সোলার সাইকেল : দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তিন ছাত্র ‘সোলার সাইকেল’ আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলায় এটি সূর্যের আলোয় চার্জ হয়। যদি রাতে চালানো হয় তাহলে রাস্তায় অন্যান্য যানবাহনের হেডলাইটের আলোতেও এটি চার্জ হবে। ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার চলতে সক্ষম এ সাইকেলের দামও যে-কারোর নাগালের মধ্যেই। যদি চলতে চলতে কখনো চার্জ শেষ হয়ে যায় তাহলে স্বাভাবিক সাইকেলের মতো প্যাডেল ব্যবহার করেও চালানো যাবে। এতেও ব্যাটারিগুলো চার্জ হতে থাকবে। সাইকেলটি প্রস্তুত করেন দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাওয়ার টেকনোলজির ষষ্ঠ পর্বের দ্বিতীয় শিফটের তিন ছাত্র। তারা হলেন শহরের বাসুনিয়াপট্টির মাধব মল্লিকের ছেলে বিজয় মল্লিক (১৮), মাশিমপুরের আবদুস সামাদের ছেলে সাব্বির হোসেন এবং নীলফামারী জেলার বেড়াকুঠির হেমন্ত কুমার রায়ের ছেলে শান্ত কুমার রায় (১৮)। বিজয়, সাব্বির ও শান্তর তৈরি সোলার সাইকেল তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ১৩ হাজার টাকা।

নকল-ভেজাল ওষুধ চেনার সফটওয়্যার : ওষুধশিল্প খাতে দেশ অনেক এগিয়ে গেলেও নকল ওষুধ উৎপাদনে পিছিয়ে নেই অসাধু ব্যবসায়ীরা। আসলের পাশাপাশি নকল ও ভেজাল ওষুধে সয়লাব দেশ। মাঝেমধ্যে প্রশাসনিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল-ভেজাল ওষুধ উদ্ধার হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয়, জেল-জরিমানাও হয়। কিন্তু নকল ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত থামে না। সাধারণ এমনকি সচেতন মানুষজনের পক্ষেও ওষুধে আসল-নকল চিহ্নিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। নকল ওষুধ চেনার কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান বের করেছেন দেশের দুই সহোদর তরুণ উদ্ভাবক। সৌভিক আসওয়াদ ও সৌমিক আসওয়াদের উদ্ভাবন করা প্রযুক্তি দেশের ওষুধ খাতে একরকম বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। তাদের ‘প্যানাসিয়া’ নামের একটি স্টার্টঅ্যাপের মাধ্যমে ওষুধের গায়ে থাকা নির্দিষ্ট কোডটি ‘২৭৭৭’ নম্বরে এসএমএস করে বা ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে আসল-নকল ওষুধ শনাক্ত সম্ভব হচ্ছে।

জলে-স্থলে চলাচল উপযোগী গাড়ি : ফরিদপুরের শিবরামপুর এলাকার দরিদ্র শেখ হাসমত আলীর ছেলে হাবিবুর রহমান ইমরানের ইচ্ছার গল্প যেন কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে। স্বল্পশিক্ষিত হাবিবুর রহমান ইমরান সম্প্রতি একটি গাড়ি তৈরি করেছেন। তার এ গাড়িটি যেনতেন গাড়ি নয়। একই সঙ্গে এ গাড়িটি যেমন চলতে পারে স্থলে, তেমনি চলে পানিতেও। এক বছরের পরিশ্রম ও ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা খরচের পর ইমরান এ গাড়ি বানাতে সক্ষম হয়েছেন। এর নাম দিয়েছেন বোট অ্যান্ড কার। গাড়িটিতে ১৫ জন যাত্রী বসতে পারে। সামনের দিকটা বিমানের আদলে তৈরি। গাড়িটিতে রয়েছে টিভি-সিডি। শ্যালো মেশিনের ইঞ্জিন দিয়ে গাড়িটি বানানো হলেও আধুনিক ইঞ্জিন লাগাতে পারলে এতে আরও যাত্রী বহন সম্ভব হবে বলেও দাবি করেছেন হাবিবুর। গাড়িটিতে স্থাপন করা হয়েছে মাছ ধরার যন্ত্র। পানিতে চলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাছও তুলে আনা যায়। হাবিবুর রহমান ইমরান শুধু গাড়ি আবিষ্কারই নয়, তিনি তৈরি করেছেন বিদ্যুৎ ছাড়া হস্তচালিত পাম্প, ডিম ফোটানো মেশিন ও রিমোট কন্ট্রোল্ড বেবি কার। তার প্রথম তৈরি ব্যাটারিচালিত বেবি কার যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রাথমিকভাবে ৩০টির অর্ডারও দেয়। কিন্তু টাকার অভাবে গাড়ি বানাতে পারেনি ইমরান।

আমির হোসেনের জ্বালানিবিহীন গাড়ি : তেল-গ্যাস ছাড়াই চলে, আধুনিক সুবিধাসহ এমন গাড়ি তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বগুড়ার যন্ত্রকৌশলী আমির হোসেন। পরিবেশবান্ধব এই গাড়ির কয়েকটি মডেল এখন চলছে বগুড়া ও সিলেট শহরে। নাম দিয়েছেন ‘রফ-রফ তাহিয়া’, অর্থ হলো ‘সুন্দর ও দ্রুততম যান’। পাঁচ আসনের ২৫০ কেজি ওজনের প্রাইভেটকারটি চলতে তেল-মবিল লাগে না। প্রয়োজন নেই সিএনজিরও। পরিবেশবান্ধব গাড়িটি আরোহীদের নিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। প্রতি আট ঘণ্টা পর পর শুধু ২৫ টাকা দামের একটি কার্বন বদলাতে হয়। আমির হোসেনের রফ-রফ তাহিয়া তৈরিতে খরচ হয় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। এ পর্যন্ত দুই রকম কার ও একটি বাসের মডেলে তিনি গাড়ি প্রস্তুত করছেন। অন্যদিকে সিলিন্ডারে শুধু বাতাস ভরেই চালানোর মতো মোটরসাইকেল উদ্ভাবন করেছেন হবিগঞ্জের তরুণ হাফেজ মো. নুরুজ্জামান। জ্বালানি তেল ছাড়াই শুধু হাইড্রোলিক পদ্ধতির গিয়ার বক্স প্রযুক্তিতে একটি সিলিন্ডারের বাতাসেই চলবে এয়ারবাইকটি। একবার বাতাস ভরলেই সাইকেলটি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে ৪০ কিলোমিটার পথ চলতে পারবে। চট্টগ্রাম শ্যামলী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নরত মো. নুরুজ্জামানের বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রিচি গ্রামে।

বিদ্যুৎ ছাড়াই জ্বলবে বাতি : প্রায় বিনা খরচে বিদ্যুৎ ছাড়াই বাতি জ্বালানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন কাপ্তাই জোনে দায়িত্বরত সেনাবাহিনীর ৭ ইঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটালিয়নের প্রকৌশলীরা। তারা মাত্র ৩০ টাকা খরচ করে বিশেষ এক ধরনের ‘সোলার বোতল ভাল্ব’ তৈরি করেছেন, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই ৫৫ ওয়াট ভাল্বের সমপরিমাণ আলো দেয়। একটি বোতল বাল্বের কার্যকারিতা থাকবে কমপক্ষে পাঁচ বছর। দুর্গম পার্বত্যাঞ্চল, বড় বড় শহরের বস্তি এলাকা এবং বিভিন্ন কলকারখানা বা গোডাউনে এই পদ্ধতির ভাল্ব বেশি কাজে লাগবে বলে জানান উদ্ভাবক কাপ্তাই সেনা জোনের কর্মকর্তারা।

তথ্য সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন