Green Energy Foundation of Bangladesh (GEFB)

আয়ুষ্কালজুড়ে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে

রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি যেভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তাতে আয়ুষ্কালজুড়েই এটি পরিচালনার জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে বাংলাদেশকে। নির্মাণ চুক্তির পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার জন্যও সরকারকে রাশিয়ার সঙ্গে আলাদা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) চুক্তি করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ করবে রাশিয়া। এ ছাড়া প্রকল্পের প্রযুক্তি ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় বুঝে নেওয়ার মতো জনবলের অভাব থাকায়, এ ক্ষেত্রেও রাশিয়ার প্রতি আস্থা না রেখে উপায় নেই।
এসবই এ প্রকল্পের দুর্বলতা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ২০০৯ সালে সরকার যখন রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন থেকে জনবল তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করলে এই শূন্যতা সৃষ্টি হতো না। বিদেশি কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেও সরকার এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারত। সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হতো না।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটির নির্মাণপর্ব শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। প্রকল্পের প্রাথমিক পর্বের কাজ প্রায় শেষ। নির্মাণপর্ব শুরুর জন্য এক বছরের সাময়িক অনুমতি (জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত) ‘সাইট লাইসেন্স’ দিয়েছে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ)। রাশিয়ার কোম্পানি রোসাতোমের সঙ্গে সাধারণ চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) সই হয়েছে। রুশ সরকারের সঙ্গে সই হয়েছে ঋণচুক্তিও। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যয় ও উচ্চতর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিনির্ভর এ প্রকল্পের নির্মাণপর্বের যাত্রা শুরু হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শৌকত আকবর প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে ওঅ্যান্ডএম চুক্তি করা হলেও রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাবেন দেশের লোকেরাই। এ জন্য চলতি মাস (অক্টোবর) থেকেই পরিচালন ব্যবস্থাপক পর্যায়ের জনবল প্রশিক্ষণ শুরু হবে। রাশিয়াই এই প্রশিক্ষণ দেবে। এই জনবলই হবে রূপপুর প্রকল্পের কর্ণধার।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে ঘিরে দেশে একটি পারমাণবিক অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য ভারতের সহায়তা নেওয়া হবে বলে জানিয়ে শৌকত আকবর বলেন, এ ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে এ বছরই একটি চুক্তি সই হবে।

নিরাপত্তা ও জনবলের প্রশ্ন

রূপপুর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, প্রযুক্তি পরিবর্তন করায় এখন তা কমেছে। শুরুতে এই প্রকল্পে ‘ভিভিইআর ১০০০’ প্রযুক্তির পারমাণবিক চুল্লি (নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর) ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। অপেক্ষাকৃত পুরোনো ও যথেষ্ট নিরাপদ বিবেচিত না হওয়ায় ইউরোপে এই প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তাই রাশিয়ার নতুন উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক ‘থ্রি প্লাস’ প্রজন্মের ‘ভিভিইআর ১২০০’ প্রযুক্তির চুল্লি রূপপুরে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার বাইরে অন্য কোনো দেশে এ প্রযুক্তির চুল্লি এখনো চালু না হলেও রাশিয়ায় একটি চালু হয়েছে। দেশটি এই প্রযুক্তি বেশি নিরাপদ বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে। ফলে অনেক দেশ এখন এ প্রযুক্তির প্রতি ঝুঁকছে।

81313aa59d2230251046ffae03f9df6e-Roopur1

তবে রূপপুর প্রকল্পের জনবল নিয়ে যে প্রশ্ন ছিল, তা এখনো রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত—রূপপুর প্রকল্পের জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গাইডলাইন তা সমর্থন করে না। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মতিন বলেন, আইএইএর গাইডলাইন অনুযায়ী কোনো দেশে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রথমেই বিবেচনায় নিতে হয় জনবলের বিষয়টি। যদি দক্ষ জনবল না থাকে, তাহলে জনবল তৈরি না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা উচিত না।

রূপপুরের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে বলে উল্লেখ করে আবদুল মতিন আরও বলেন, দক্ষ জনবল শুধু যে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য, তা নয়। প্রাক্‌-প্রকল্প কার্যক্রমেও দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তা সমান। এ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সমীক্ষা পরিচালনা করা, সমীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা, প্রকল্প প্রস্তাব বিবেচনা, সরবরাহকারীর (এ ক্ষেত্রে রাশিয়া) সঙ্গে দেনদরবার (নেগোসিয়েশন), চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত, প্রযুক্তি নির্ধারণ এবং নির্ধারিত প্রযুক্তি অনুযায়ী মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রভৃতি। একবার চুক্তি সই হলে এসব বিষয়ে আর কিছু করার থাকে না।

এ সম্পর্কে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইএইএ গাইডলাইন অনুসরণ করে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হলে প্রকল্প শুরু করতে অনেক বিলম্ব হতো। তাই রূপপুর প্রকল্পের সমীক্ষা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি নির্ধারণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ব্যয় প্রাক্কলন—সব ক্ষেত্রেই রাশিয়ার ওপর নির্ভর করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য যে জনবল দরকার, তার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যখন চালু হবে, তখন এই জনবলই তা পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারবে।

মন্ত্রণালয়ের সূত্রে আরও জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালু করে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার পরও বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরেই এর পরিচালন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে রাশিয়াকে সম্পৃক্ত রাখা হবে। এ ব্যাপারে রাশিয়ার সঙ্গে একটি আলাদা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্ট) চুক্তি সই করা হবে। এ জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান বিষয়গুলো বুঝে নেওয়ার মতো জনবল তৈরির পর প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে রাশিয়ার সঙ্গে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রয়োজন হতো না।

সময় বেড়েছে

বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে গত ২৫ ডিসেম্বর সই হওয়া সাধারণ চুক্তিতে রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা (১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার)। এর মধ্যে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা (১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫ কোটি ডলার) ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। এ জন্য বর্তমান হারে সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা (১ হাজার ৮২৩ কোটি ডলার)।

এর বাইরে প্রকল্পের প্রস্তুতিপর্বে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা (৫৫ কোটি ডলার)। এর মধ্যে রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা (৫০ কোটি ডলার)। এ ছাড়া প্রকল্পের আয়ুষ্কালজুড়েই পরিচালন ব্যয় থাকবে। পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো বিষয়গুলোতে থাকবে কিছু অদৃশ্য ব্যয়ও। সব মিলিয়ে রূপপুর প্রকল্পের জন্য ব্যয় হবে প্রায় পাঁচটি পদ্মা সেতু প্রকল্প ব্যয়ের সমান অর্থ। সরবরাহকারী পক্ষের দাবি—রূপপুর প্রকল্প থেকে ৫০ বছর ধরে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

প্রকল্পের শুরুর দিকে (২০১০-১১) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যয় সম্পর্কে একটি ধারণা প্রকাশ করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ‘ভিভিইআর ১০০০’ প্রযুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার কোটি টাকার মতো (৪০০ কোটি ডলার) ব্যয় হতে পারে। তবে সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের প্রযুক্তি ও ব্যয় সম্পর্কে চূড়ান্ত কিছু বলা যায় না বলেও তখন বলা হয়েছিল।

প্রকৌশলী আবদুল মতিন রূপপুর প্রকল্প নিয়ে তাঁর লেখা নিউক্লিয়ার পাওয়ার অ্যান্ড রূপপুর বইয়ে ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিবেচনায় রূপপুর প্রকল্পের একটি ব্যয় প্রাক্কলন করেছেন; যেখানে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা (১০ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় এর চেয়েও প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে পরমাণু শক্তি কমিশনের সূত্র জানায়, পদ্মার চর হওয়ায় রূপপুরের মাটি বেলে। ওই মাটিতে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প-সহনীয় (অপারেশনস অ্যান্ড ডিজাইন-বেসিস) পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির জন্যই ব্যয় বেড়েছে অন্তত ১০০ কোটি ডলার। এ ছাড়া পদ্মায় সারা বছর প্রকল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পাওয়া যাবে না। তাই ‘ক্লোজড সাইকেল ওয়াটার টাওয়ার’ করতে হবে। এ জন্যেও ব্যয় বেড়েছে ১০০ কোটি ডলারের মতো।

প্রস্তুতি থেকে নির্মাণপর্বে

প্রকল্পেরপ্রাথমিকপর্বে নির্ধারিত এলাকার (রূপপুর) মাটি ও বায়ুর মান, পানির প্রাপ্যতাসহ ৫০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানো হয়। এসব সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রকল্পের প্রযুক্তি নির্ধারণ ও নকশা প্রণয়ন করা হয়। ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘প্রিলিমিনারি সেফটি অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট (পিএসএআর)’ উপস্থাপন করা হয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) কাছে। এটি পর্যালোচনা করে বিইআরএ কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে প্রকল্পের সাময়িক সাইট লাইলেন্স দেয়।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বিষয়ে অভিজ্ঞ দেশি-বিদেশি কয়েকটি সূত্র জানায়, সাইট লাইসেন্স দেওয়ার আগে পিএসএআর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অন্তত ছয় মাস সময় লাগার কথা। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ার মধ্যে এই সময়ের হিসাবটি পাওয়া যায় না। তা ছাড়া এ কাজের জন্য কোনো জনবলও নিয়োগ করা হয়নি। এ কারণে ধারণা করা যায়, পিএসএআর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। এই ধারণা সত্যি হলে, তা পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিষয়টি পারমাণবিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এটি তাড়াহুড়ো করে দায়সারাভাবে করা বাঞ্ছনীয় নয়।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সূত্র অবশ্য পিএসএআর যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। ওই সূত্র জানায়, প্রাথমিকপর্বের কাজ এখনো সম্পূর্ণ শেষ না হওয়ায় বিএইআরএ ওই শর্তগুলো আরোপ করেছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ প্রাথমিকপর্বের কাজ শেষ হওয়ার মাধ্যমে শর্তগুলোও পূরণ হবে। অবশ্য নির্মাণপর্ব শুরুর আগে রাশিয়ার সঙ্গে আরও চারটি চুক্তি সই করতে হবে। এগুলোর বিষয়বস্তু হলো প্রকল্পের আয়ুষ্কালজুড়ে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, স্পেন্ট ফুয়েল (পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপজ্জনক জ্বালানি বর্জ্য) ফেরত নেওয়া, প্রকল্পের যেকোনো পর্যায়ে যেকোনো বিষয়ে চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত সেবা সরবরাহ করা এবং পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নের অংশবিশেষ সম্পন্ন করা।

রূপপুর প্রকল্পের সূত্রগুলো জানায়, এসব চুক্তির খসড়া প্রণয়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে যাবে। এগুলো সই না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের মূল চুক্তিও কার্যকর হবে না। প্রকল্পের নির্মাণপর্বে এ ছাড়া আরও অনেক প্রটোকল বিভিন্ন সময় সই করতে হবে, যার সবই হবে মূল চুক্তি বাস্তবায়নের সব ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য।

জনবল প্রশিক্ষণ এ বছর থেকেই

বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালন ব্যবস্থাপক পর্যায়ের জনবল প্রশিক্ষণের জন্য চলতি মাস থেকে পর্যায়ক্রমে ৬৭ জন প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হবে। তাঁদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। তাই রাশিয়াই তাঁদের প্রশিক্ষণ দেবে।

তাত্ত্বিক পড়াশোনার পাশাপাশি পরিচালন ব্যবস্থাপক পর্যায়ের এ কর্মকর্তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এই প্রশিক্ষণ হবে রাশিয়ায় ইতিমধ্যে চালু হওয়া ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবর এই প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তাদেরই রূপপুর প্রকল্পের কর্ণধার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ একবারেই শেষ হবে না। প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও কারিগরি অগ্রগতির বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার তাঁদের প্রশিক্ষণের জন্য যেতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণ নেওয়াই সব নয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করার জন্য তাঁদের প্রত্যেককে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স পেতে হবে। এ ধরনের লাইসেন্স ছাড়া কোনো পেশাজীবী কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কাজ করার অনুমতি পান না।

শৌকত আকবর বলেন, এই ৬৭ জনের মধ্য থেকে প্রশিক্ষণের ফলাফলের ভিত্তিতে আট জনকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের আটটি প্রধান বিভাগের মূল দায়িত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে। সেখানে ৬৭ জনের মধ্য থেকেই প্রশিক্ষক নিয়োগ করা হবে।

পরমাণু শক্তি কমিশনের সূত্রে জানা যায়, রূপপুর প্রকল্পের সাধারণ চুক্তিতে (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) নির্মাণকাজের যে ধারাবাহিকতা নির্দেশিত আছে, তার সঙ্গে সংগতি রেখে জনবল প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৬৪৫ জনকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৮৫০ জনের (৩০ শতাংশ অতিরিক্ত হিসাবে) প্রশিক্ষণ হবে রাশিয়ায়। অবশিষ্ট ৭৯৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে দেশে স্থাপিত ইনস্টিটিউটে।

প্রশিক্ষণ পাওয়া সবাই রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার কাজে নিয়োজিত হবেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ পরমাণু শক্তি কমিশনের লক্ষ্য—বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই যেন এই প্রশিক্ষিত জনবলকে কেন্দ্রের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বে সক্রিয় করা যায়।

অবশ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর পর্যায় (এক বছর) শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরাই সেখানে মূল দায়িত্বে থাকবেন। দেশীয় কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে থেকে এমনভাবে কাজ করবেন, যাতে রাশিয়া কেন্দ্রটি বাংলাদেশ কতৃ‌র্পক্ষের কাছে হস্তান্তরের পর তাঁরা এর দায়িত্ব নিতে পারেন।

অবকাঠামো উন্নয়ন ভারতের সহায়তায়

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দেশে একটি স্থিতিশীল পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। এ বিষয়ে সহায়তার জন্য ভারতের সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি করবে সরকার। ইতিমধ্যে সেই চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া অনুস্বাক্ষর করেছে দুই দেশ। শিগগিরই চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫ জন কর্মকর্তা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এই প্রশিক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন চুক্তির অধীন নয়। এটা নেওয়া হয়েছে কারিগরি সহায়তা হিসেবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য সরকারকে আলাদা চুক্তি করতে হবে রাশিয়ার সঙ্গে
প্রকল্পের প্রযুক্তি ও কারিগরি বিষয় বুঝে নেওয়ার মতো জনবল নেই
ডিসেম্বরে শুরু হবে নির্মাণপর্ব

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, শৌকত আকবর বলেন, পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সব ধরনের প্রশিক্ষণ-সহায়তা ভারতের কাছ থেকে নেওয়া হবে। এ জন্য চলতি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি পর্যায়ে একটি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কয়েকজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, পারমাণবিক অবকাঠামো মানে কোনো ভৌত অবকাঠামো নয়। এটি হচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি (নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রোগ্রাম) সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন ও পরিচালনার জন্য সার্বিকভাবে সমন্বিত একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই ব্যবস্থার মধ্যে পারমাণবিক গোয়েন্দা ইউনিট গঠন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত। এই কাজে বৃহৎ একটি বিশেষায়িত জনবলের প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হয়। এই কাজে ভারতের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

আইএইএ গাইডলাইনে একটি পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার জন্য পারমাণবিক অবকাঠামোকে বলা হয়েছে ‘অপরিহার্য বিষয়’। আইএইএর অঙ্গসংস্থা ইন্টিগ্রেটেড নিউক্লিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপ (আইএনআইজি) ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে পারমাণবিক অবকাঠামোর বিষয়টি হালনাগাদ করেছে। এতে বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুতের জগতে নবাগত দেশগুলো যাতে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও টেকসই পদ্ধতিতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে, সে জন্য অবকাঠামো হচ্ছে অতি জরুরি।

পরমাণু শক্তি কমিশনের সূত্র জানায়, পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নের অনেক কিছু রাশিয়াই সম্পন্ন করবে চুক্তির অংশ হিসেবে। ভারতের সহায়তা নেওয়া হবে এই খাতের জনবল প্রশিক্ষণ ও চুক্তিবহির্ভুত বিষয়গুলোতে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কতৃ‌র্পক্ষের (বিইআরএ) ক্ষমতায়ন, আইনগত ও নিয়ন্ত্রণ-কাঠামো তৈরি, সংকটকালীন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, পারমাণবিক গোয়েন্দা সার্ভিস, সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রভৃতি রয়েছে।

এ বিষয়ে অভিমত জানতে চাইলে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ভারতও যেহেতু ভিভিইআর প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছে, সেহেতু তাঁদের কাছ থেকে বাংলাদেশ পরামর্শ সহায়তা নিতে পারে। এ ছাড়া ভারত কিছু উন্নতমানের পারমাণবিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করেছে। সেখান থেকে বাংলাদেশ দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পারে।

বিদ্যুতের দাম নিয়ে বিভ্রান্তি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কেন্দ্র স্থাপনে সরকার ও রাশিয়ার মধ্যে মূল চুক্তিতে যে ব্যয় ধরা হয়েছে (১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা) তার বাইরেও বড় অঙ্কের ব্যয় হবে। জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) কেনা, বর্জ্য ফেরত পাঠানো প্রভৃতি কাজেও বাড়তি অর্থ খরচ হবে। এ ছাড়া পারমাণবিক অবকাঠামো গড়ে তোলা, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরও অর্থ ব্যয় হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল চুক্তিতে উল্লিখিত ব্যয় অনুযায়ী রূপপুর কেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট (১ কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুতের দাম পড়বে প্রায় পাঁচ টাকা। আর বাড়তি যেসব ব্যয় রয়েছে, সেগুলোও হিসাবে নিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে সাড়ে আট টাকার মতো।

এ প্রসঙ্গে শৌকত আকবর বলেন, পরিচালনের বাড়তি ব্যয় ধরলেও এই কেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কোনোভাবেই সাড়ে আট টাকা হবে না।

প্রকৌশলী আবদুল মতিন বলেন, রূপপুর প্রকল্পের সমীক্ষার জন্য ব্যয় হয়েছে সাড়ে পাঁচ কোটি ডলার। এর মধ্যে ঋণের পাঁচ কোটি ডলার সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এই ব্যয় প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে যোগ করে দেখানো হয়নি। দেখানো হলে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৭০ কোটি ডলার (১ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা)। এ ছাড়া পরিচালন ব্যয়ও রয়েছে। কাজেই বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন খরচ শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা এখন বলা যাচ্ছে না।

ব্রিটিশ নিউক্লিয়ার ইনস্টিটিউটের ফেলো এবং মুখ্য পারমাণবিক নিরাপত্তা পরামর্শক হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ এ রহমান এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিন-এর গত ১ জানুয়ারি সংখ্যায় এক নিবন্ধে বলেছেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল শেষে সেটি নিস্ক্রিয় করা (ডিকমিশনিং) এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যে অর্থের প্রয়োজন হবে, তা-ও প্রকল্প ব্যয় হিসেবে ধরা উচিত। তাঁর মতে, এই ব্যয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ব্যয়ের প্রায় সমান। রূপপুরে ক্ষেত্রে এই ব্যয় বিবেচনায় নিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় পড়বে প্রায় সাড়ে আট টাকা।

এ ছাড়া ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্র চালানোর জন্য প্রতি বছর পারমাণবিক জ্বালানি কিনতে ব্যয় হবে ১০ থেকে ১৫ কোটি ডলার। পরিচালন ব্যয় হবে প্রতি বছর পাঁচ কোটি ডলার। সর্বোপরি রয়েছে ঋণের সুদ। এর সবই হিসাবে নিয়ে প্রকৃত ব্যয় হিসাব করা উচিত। কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত প্রথম দুই বছরের জ্বালানি মূল চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। এরপর থেকে প্রকল্পের আয়ুষ্কালজুড়েই জ্বালানি কিনতে হবে।

সর্বোপরি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সব সময়, সব দেশেই কিছু অদৃশ্য ব্যয় থাকে বলে উল্লেখ করে সরকারি সূত্র জানায়, রূপপুরের ক্ষেত্রেও তা থাকবে।

তথ্য সুত্র ঃ প্রথম আলো