এবার দেশেই সৌর প্যানেল!

একটা কাচের স্লাইড বাড়িয়ে ধরে বিজ্ঞানী মুহাম্মদ শাহরিয়ার বাসার বললেন, ‘এই নিন আমাদের বানানো সৌর কোষ।’

চোখের সামনে যে জিনিসটা দেখলাম, সেটা খুবই ক্ষুদ্র আর পাতলা একটা কাচের টুকরো। মামুলি ধরনের। তার মধ্যে খোপ খোপ দাগ টানা। শাহরিয়ার বাসার বললেন, এই কাচের মধ্যেই সাতটি অতি সূক্ষ্ম স্তর সাজানো আছে। একেকটা স্তর একেক মৌলিক ধাতু দিয়ে বানানো। ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগুলো বানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের বিজ্ঞানীরা ‘ক্লিন রুম ল্যাব’ পরীক্ষাগারের দ্বিতীয় প্রজন্মের সৌর কোষের ফেব্রিকেশন করছেন l ছবি: বিসিএসআইআর

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) নীরব গবেষণাগারে তরুণ বিজ্ঞানীর হাতে যে কাচটি ধরা, সেটার মধ্যে আসলে একটা বদলে যাওয়া দেশের ভবিষ্যৎ প্রতিফলিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানী শাহরিয়ার বাসার ও তাঁর দল দেশে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় প্রজন্মের সৌর কোষ বা থিন ফিল্ম সোলার সেল তৈরি করেছেন। অবশ্যই গবেষণাগারে। মেঘলা দিনেও এ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির পথে এটি দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ থেকে দেশেই বাণিজ্যিকভাবে সোলার প্যানেল তৈরি শুরু হবে। বিদেশ থেকে এগুলো অনেক দাম দিয়ে আর কিনে আনতে হবে না।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে যে সৌর কোষ তৈরি করেছেন, সূর্যের আলো থেকে সেটার বিদ্যুৎ উৎপাদন করার ক্ষমতা (এফিশিয়েন্সি) এখন পর্যন্ত ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। উচ্চতর গবেষণা করে এই ক্ষমতা বাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে নেওয়ার কাজ চলছে। আগামী বছর দুয়েকের মধ্যে এফিশিয়েন্সি ১০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া যাবে। তখন এটা বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে চলে যাবে।

সোলার হোম সিস্টেম অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানকারী সরকারি সংস্থা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) জানিয়েছে, দেশে বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ হোম সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়। এতে প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই সৌর প্যানেলগুলো প্রথম প্রজন্মের ও ব্যয়বহুল। তাই অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাজার বিবেচনা করলে দ্বিতীয় প্রজন্মের সৌর কোষের এই প্রযুক্তির শুরুটা বাংলাদেশের জন্য এক অপার সম্ভাবনা। এ এক অন্য বাংলাদেশের যাত্রা শুরু।

প্রথম বনাম দ্বিতীয় প্রজন্ম

প্রথম প্রজন্মের সৌর কোষগুলোকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে ক্রিস্টালাইন সিলিকন সৌর কোষ। গবেষণা করে এগুলোর ক্ষমতা (এফিশিয়েন্সি) বাড়ানোর আর সুযোগ নেই। আর দ্বিতীয় প্রজন্ম হচ্ছে থিন ফিল্ম সৌর কোষ। উন্নত বিশ্ব এখন দ্বিতীয় প্রজন্ম নিয়ে গবেষণার দিকে ঝুঁকছে। সারা বিশ্বে এখন ১০ শতাংশ সোলার প্যানেল হচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের। সক্ষমতা বাড়িয়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের এই প্রযুক্তি বহুদূর নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।

বাংলাদেশে বাসাবাড়ির ছাদে এবং বড় উৎপাদন কেন্দ্রগুলোয় সৌরবিদ্যুৎ তৈরিতে যে সৌর প্যানেলগুলো ব্যবহৃত হয়, তার সবই প্রথম প্রজন্মের সৌর কোষ দিয়ে তৈরি।

বাংলাদেশে দ্বিতীয় প্রজন্মের সৌর কোষ তৈরির এই মহাযজ্ঞ শুরু হয় ২০১২ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের জ্বালানি গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (আইএফআরডি) পরীক্ষাগারে। সেখানে বিজ্ঞানীরা চার বছর ধরে ব্যয়বহুল যন্ত্র কিনে আটটি আলাদা পরীক্ষাগার প্রস্তুত করেন। পাশাপাশি তাঁরা সেখানে সৌর কোষ নিয়ে গবেষণাও চালিয়ে যেতে থাকেন।

নিবিড় অধ্যবসায়

সৌর কোষ তৈরির গবেষণাটি দীর্ঘ অধ্যবসায়ের। একটি ২৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ৫৪ ইঞ্চি প্রস্থের সৌর প্যানেলে ৩৬টি সৌর কোষ (সোলার সেল) থাকে। একেকটি সৌর কোষে সাতটি স্তর। বিজ্ঞানীরা কাঁচামাল হিসেবে কাচ ব্যবহার করে সৌর কোষের স্তরগুলো সাজিয়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি সৌর কোষ তৈরি করতে পেরেছেন। এ কাজে প্রয়োগ করতে হচ্ছে ন্যানো টেকনোলজি বা অতিক্ষুদ্র প্রযুক্তি।

বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা প্রথম প্রজন্মের একটি সৌর কোষ তৈরি করতে সক্ষম হন ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। তখন এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (এফিশিয়েন্সি) ছিল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। এ বছরের ১২ জুলাই বিজ্ঞানীরা টানা ৯৬ ঘণ্টার চেষ্টায় ৩ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ সেন্টিমিটার প্রস্থের সর্বশেষ সৌর কোষটি তৈরি করেন। পরে এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা পরীক্ষা (সান সিমুলেটর টেস্ট) করা হয়।

সৌর কোষ বানানোর জটিল প্রক্রিয়ার এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিসিএসআইআরের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ শাহরিয়ার বাসার। মোট ১১ জন বিজ্ঞানীর একটি দল এর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ৫ জনই নারী বিজ্ঞানী।

দেশে বসে ই-মেইলে পরামর্শ

জটিল এই ন্যানো প্রযুক্তি এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানীদের দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরে যেতে হয়নি। অথচ বিশ্বের অগ্রগণ্য বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিচ্ছেন তাঁরা। আর এটা করা হচ্ছে ই-মেইলে। সৌর কোষের একেকটি স্তর তৈরিতে তাঁরা মালয়েশিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সোলার এনার্জি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নওশাদ আমিন, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড করকিশসহ কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানী, অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত ই-মেইলে পরামর্শ ও সহযোগিতা নিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ শাহরিয়ার বাসার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বের অগ্রসর গবেষণাগারগুলো ৪০ বছর আগে থেকে এ ধরনের গবেষণা চালিয়ে আসছে। সেদিক থেকে আমরা নিতান্ত নবীন। তাই আমাদের এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে বিশ্বের কয়েকজন বিজ্ঞানীর শরণ নিতে হয়েছে। রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত এই প্রযুক্তির নতুন কিছু শিখছি।’

এই সৌর কোষ তৈরির কৃতিত্বটা বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা একা নিতে চান না। মুহাম্মদ শাহরিয়ার বাসার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোলার সেল বানাতে আমরা একাই কাজ করছি না। আমাদের পরীক্ষাগারের এ কাজের পেছনে পরমাণু শক্তি কমিশন, বুয়েট, ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ প্রায় ২০ জনের একটি দল নিয়মিত সহযোগিতা করছেন।’

২০২০ সালের মধ্যে দেশে বিদ্যুতের ১০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। সরকারের সে রকমই পরিকল্পনা। তার মানে, ওই সময়ের মধ্যে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হবে সৌরবিদ্যুৎ। আর তা করতে হলে বিপুল পরিমাণ সৌর প্যানেল কিনতে হবে বিদেশ থেকে।

বাংলাদেশ এখনই বিপুল পরিমাণ সৌর প্যানেল আমদানি করছে। চলতি বছরের জুন মাসে ‘রিনিউঅ্যাবলস ২০১৭ গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষ স্থানে৷ সারা বিশ্বে ৬০ লাখ সৌর প্যানেলের ৪০ লাখই বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়৷ প্যারিসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিনিউঅ্যাবল এনার্জি পলিসি নেটওয়ার্ক ফর টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি (আরইএন-২১) এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে৷

প্রথম প্রজন্মের চেয়ে প্রায় ৫০ ভাগেরও কম খরচ হয় দ্বিতীয় প্রজন্মের সৌর কোষ তৈরিতে। এই সৌর কোষ বানাতে সিলিকনের বদলে কপার, টিন, দস্তা ও সালফার, কাচ ইত্যাদি সহজলভ্য ও কম দামি পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া দ্বিতীয় প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি মেঘলা দিনেও (ডিফিউজ সানলাইট) বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। অথচ, প্রথম প্রজন্মের সোলার সেল মেঘলা দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না।

এই প্রযুক্তির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দুই প্রজন্মের প্রযুক্তির তুলনা করলে দ্বিতীয় প্রজন্মের সৌর কোষের উৎপাদন খরচ কম। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার ক্ষমতা অনেক বেশি। খরচের দিক চিন্তা করে দ্বিতীয় প্রজন্মই বেশ সাশ্রয়ী। তিনি বলেন, ‘এই প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক অবস্থানে নেই। কিন্তু আমরা তো বানাতে পারছি, শুরু করেছি। এটা তো ভালো। গবেষণা করলে আস্তে আস্তে এফিশিয়েন্সি বাড়বে। একটা সময় পরে হয়তো আমরা বৈশ্বিক অবস্থানে যেতে পারব। আমরা বলতে তো পারছি, বিশ্বে যে অল্প কয়েকটি দেশ সোলার সেল তৈরি করে, তার মধ্যে আমরাও আছি। এটা বাংলাদেশের প্রযুক্তির দুনিয়ায় এক নতুন সংযোজন হলো।’

আরও কিছু কাজ বাকি

সারা বিশ্বের সৌর কোষ নিয়ে কাজ করা পরীক্ষাগারগুলোতে সৌর কোষের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা সর্বশেষ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলে তা ন্যাশনাল রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ল্যাবরেটরির (এনআরএএল) একটি ডেটাবেইসে নথিভুক্ত করা হয়। সেই রেকর্ডে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রজন্মের সৌর কোষের এফিশিয়েন্সি ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্জন যদিও ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ, তবে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে বেশি দিন লাগবে না।

এ ব্যাপারে জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ শাহরিয়ার বাসার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাইরের দেশের মতো আমাদের সোলার সেলের এফিশিয়েন্সি এখনো আসেনি। সোলার সেলের সাতটি স্তরে ন্যানো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অনেক জটিল কাজ করা হয়। একেকটা স্তরে অনেক মিস ম্যাচ হয়। এগুলো দূর করতে পারলেই এফিশিয়েন্সি আরও বাড়ানো যাবে।’ তিনি আশা করছেন, এ বছরের শেষ নাগাদ তাঁদের গবেষণায় সৌর কোষের এফিশিয়েন্সি দশের ঘর ছুঁতে পারবে। আর আগামী দুই বছরের মধ্যেই তাঁরা বিশ্বপর্যায়ে রেকর্ড করার মতো অবস্থানে যেতে পারবেন।

বাংলাদেশেই সৌর কোষ তৈরির প্রযুক্তি এই প্রথম বলে জানালেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সিলিকনের কেলাস দিয়ে তৈরি প্রযুক্তি অনেক দিনের। তাত্ত্বিকভাবে, পুরোনো সিলিকন সৌর কোষের এফিশিয়েন্সি ২৫ শতাংশের বেশি যাবে না। থিন ফিল্ম বা পাতলা স্তরের সৌর কোষ তৈরি নতুন প্রযুক্তি। এখন থিন ফিল্মেই বেশি মনোযোগ। এই সৌর কোষের পারফরম্যান্স (মেয়াদ, দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা) সন্তোষজনক হওয়ার কথা। কারণ, এটি তৈরিতে ব্যয়বহুল যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক দিকটাও দেখতে হবে। সারা বিশ্বে যেসব সৌর কোষের দক্ষতার মাত্রা, রিলায়েবিলিটির মাপের তুলনায় দেশীয় উদ্যোগ কতটা এগোচ্ছে, সেটাও গবেষণার বিবেচনায় আসতে হবে।

গবেষকেরা বলছেন, এই গবেষণা একটা শক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিচ্ছে। আগামীতে এতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করতে হবে।

তথ্য সুত্র ঃ প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *