Green Energy Foundation of Bangladesh (GEFB)

দেশের একমাত্র জলবিদ্যুত কেন্দ্র কাপ্তাইয়ে এবার যোগ হলো সাত দশমিক চার মেগাওয়াটের একটি সৌর বিদ্যুত কেন্দ্র। বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড পিডিবি কেন্দ্রটির মালিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার সৌর বিদ্যুত কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর বাইরে আরও চার বিদ্যুত কেন্দ্র এবং দশ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে দেশে মোট বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াল ২২ হাজার ৩২৯ মেগাওয়াট। একই সঙ্গে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হলো ২১১। শেখ হাসিনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষকে বিদ্যুত ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার অনুরোধ থাকবে যারা বিদ্যুত ব্যবহার করবেন তারা সাশ্রয়ী হোন, অতিরিক্ত বিদ্যুত যেন নষ্ট না হয়। বিদ্যুত ব্যবহারে সাশ্রয়ী হলে বিলটাও কম আসবে, সেটা মাথায় রাখতে হবে। কাজেই প্রত্যেকে বিদ্যুত ব্যবহারে মিতব্যয়ী ও সাশ্রয়ী হবেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যত টাকা দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন করি তার চেয়ে অর্ধেকের কম দামে বিদ্যুত সরবরাহ করে যাচ্ছি। বিদ্যুতে এভাবে ভর্তুকি দেয়া ঠিক নয়। তারপরও মানুষের কল্যাণে, মানুষের সুবিধার জন্য- আপনারা বিদ্যুত ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবেন সেই আশা করছি। সরকারে আসার পর বেসরকারী খাতে বিদ্যুত উৎপাদনে আইন করার কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা রাস্তাঘাট, অবকাঠামোগত উন্নয়ন করি। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতটা অত্যন্ত জরুরী।

সরকার প্রধান বলেন, বিদ্যুত যখন গ্রামে-গঞ্জে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় তখন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটা গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দেয়া আর বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন করা। আমরা কিন্তু সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, প্রতিটা উপজেলা যেন সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুত পায় সেজন্য আমরা ঘোষণা দিয়েছি, যেন মানুষের মধ্যে একটা উৎসাহ আসে। শতভাগ বিদ্যুত ধীরে ধীরে বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা, উপজেলা থেকে ইউনিয়নে পৌঁছে যাবে, সেটা আমরা পৌঁছাতে পারব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৯৩ শতাংশ বাড়িতে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুত পৌঁছে দিয়েছে। বিদ্যুত উৎপাদন ২২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০১ সালে যে চার হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত রেখে গিয়েছিল সেটা বিএনপি তিন হাজার দুই শ’ মেগাওয়াটে নামিয়ে এনেছিল। দেশের বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে গ্যাস বিক্রির জন্য এক সময় চাপ আসার কথাও তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আগে গ্যাসের স্বল্পতা ছিল। গ্যাস বিক্রি করার জন্য ২০০১ সালে আমাদের ওপর প্রচ- চাপ ছিল। গ্যাস আমাদের। আমরাই ১৯৯৬ সালে সরকারে এসে আন্তর্জাতিক টেন্ডার দেই। বিদেশীরা এসে গ্যাস উত্তোলনে কাজ শুরু করে। সেই সময় চাপ আসল যে, গ্যাস বিক্রি করতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষের চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত গ্যাস থাকলে সেটা বিক্রি করব- এই নীতি নিয়ে আমি ছিলাম। কিন্তু বিএনপি তখন এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল তারা ক্ষমতায় আসলে গ্যাস বিক্রি করবে। যেহেতু আমি রাজি হইনি, তার খেসারত দিতে হয়েছে- ২০০১ সালে আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে দেশ অন্ধকারে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০১ সালে যারা ক্ষমতায় এসেছিল তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল নিজেরা আর্থিকভাবে কিভাবে লাভবান হবে। নিজেদের অর্থ সম্পদের দিকেই তারা বেশি ব্যস্ত ছিল। সেই সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ সেই দিকেই তাদের নজর ছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশকে পিছিয়ে রেখেছিল।

বিদ্যুত বিভাগ সূত্র বলছে, কাপ্তাই দেশের প্রথম এবং একমাত্র সরকারী সৌর বিদ্যুত কেন্দ্র। এর আগে বেসরকারী খাতে আরও তিনটি গ্রিড সংযুক্ত সৌর বিদ্যুত কেন্দ্র উৎপাদনে আসে। তবে সৌর বিদ্যুত উৎপাদনে বেসরকারী খাত থেকে সরকারী খাত পিছিয়ে ছিল। সরকার পিডিবির অনুকূলে বড় জমি দিলেও সেখানে সৌর বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটি কোন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। উল্টো পিডিবি তহবিল সঙ্কটের কথা বলে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি সরকার অলস টাকা পড়ে থাকার যে তালিকা দিয়েছে তাতে পিডিবিতে ১৩ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে রয়েছে বলে দেখা গেছে।

এর আগে বেসরকারী খাতে টেকনাফ ২০ মেগাওয়াট, পঞ্চগড় ৮ মেগাওয়াট এবং জামালপুর ৩ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুত কেন্দ্র গ্রিডে বিদ্যুত সরবরাহ করছে। তবে সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় কোম্পানি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল) এবং চীনের ন্যাশনাল মেশিনারি এক্সপোর্ট এ্যান্ড ইমপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) দেশে ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে। সরকারের এই উদ্যোগ সফল হলে ২০২২ সালের মধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত পাওয়া যাবে। যার ৪৫০ মেগাওয়াট সৌর এবং ৫০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুত।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এছাড়াও ৪২৮ মেগাওয়াট তরল জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুত কেন্দ্রের যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়। সবকটি বিদ্যুত কেন্দ্র বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে। কেন্দ্রগুলো হচ্ছে প্যারামাউন্ট বিট্রাক এনার্জি লিমিটেডের বাঘাবাড়ি ২০০ মেগাওয়াট, ইউনাইটেড পাওয়ারের জামালপুর ১১৫ মেগাওয়াট এবং কনফিডেন্স পাওয়ার লিমিটেডের বগুড়া ১১৩ মেগাওয়াট। তিনটি কেন্দ্রই তেলচালিত। কেন্দ্রগুলো পিক আওয়ার বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময় এবং গ্রীষ্মের সঙ্কট সামাল দিতে নির্মাণ করা হয়েছে।

বিদ্যুত বিভাগ সূত্র বলছে, গত দশ বছরে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচ গুণ বেড়ে ২২ হাজার ৩২৯ মেগাওয়াট দাঁড়িয়েছে। এখন সারাদেশে আরও ৪৮ বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। যে কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৬ হাজার ১৩৮ মেগাওয়াট। এখন আটটি বিদ্যুত কেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ১৭ কেন্দ্র পরিকল্পনায় রয়েছে। যে কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।

সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুত সরবরাহ করতে উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দিতে চায়। এজন্য পর্যায়ক্রমে দেশের সকল উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুত নিশ্চিত করা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে প্রতি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২১১ উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে। বুধবার সর্বশেষ ১০ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উপজেলাগুলো হচ্ছে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, চাঁদপুরের দক্ষিণ মতলব, জয়পুরহাটের সদর উপজেলা, পাঁচবিবি এবং আক্কেলপুর, রাজশাহীর পবা, নারায়ণগঞ্জের সদর এবং রূপগঞ্জ, ঠাঁকুরগাঁও-এর হরিপুর এবং নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ। সরকার বলছে আগামী বছরের শেষ নাগাদ বাকি উপজেলা-গুলোকেও শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হবে। সেই লক্ষ্যে উপজেলাভিত্তিক বিদ্যুতায়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

শুধু শতভাগ বিদ্যুতায়ন নয় সরকার বলছে মানসম্মত বিদ্যুত দেয়া এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে। বুধবার নতুন আটটি সাবস্টেশন উদ্বোধন করা হয়েছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সরবরাহ ক্ষমতা ৫৬০ এমভিএ বৃদ্ধি পেল। সাবস্টেশনগুলো হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনায়ারণ কটন মিল, ম-লপাড়া, ফতুল্লার দাপা ও নন্দলালপুর। এদিকে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং বনশ্রী সাবস্টেশন।

প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ নজিবুর রহমানসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

তথ্য সুত্রঃ জনকণ্ঠ